মুসলমান মুসলমানের ভাই

https://totthoupatto.com/

ঈমানের বন্ধনে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

মানুষের মধ্যে সম্পর্কের অনেক ধরন রয়েছে। কেউ আত্মীয়তার সূত্রে আপন হয়, কেউ বন্ধুত্বের কারণে, আবার কেউ একই সমাজে বসবাস করার সুবাদে পরিচিত হয়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামে এমন একটি সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, যার ভিত্তি রক্তের বন্ধন, ভৌগোলিক সীমারেখা কিংবা ভাষা ও বর্ণের মিল নয়; বরং যার ভিত্তি হলো ঈমান। এই সম্পর্কই মুসলিম ভ্রাতৃত্ব।

একজন মুসলমান পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করুন না কেন, তাঁর সঙ্গে অন্য একজন মুসলমানের সম্পর্ক কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঈমানের বন্ধনে তাঁরা পরস্পরের ভাই। তাই একজনের সুখে অন্যজন আনন্দিত হবেন, দুঃখে ব্যথিত হবেন, বিপদে পাশে দাঁড়াবেন এবং একে অপরের সম্মান ও অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকবেন—এটাই ইসলামের শিক্ষা।

ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক সুন্দর করার শিক্ষা দেয় না; মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও সুন্দর ও কল্যাণময় করে তুলতে চায়। সেই কারণেই মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ইসলামী জীবনব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

অর্থ: “নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।”

— সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১০

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ আয়াত মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরে। এখানে ভ্রাতৃত্বকে নিছক সামাজিক সৌজন্য হিসেবে দেখা হয়নি; বরং ঈমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের কাছে অন্য মুমিনের সম্মান, নিরাপত্তা ও কল্যাণ উপেক্ষা করার বিষয় নয়।

মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রকৃত পরিচয়: কথায় নয়, আচরণে

কাউকে ভাই বলে সম্বোধন করা সহজ, কিন্তু ভাইয়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করাই প্রকৃত পরীক্ষা। ইসলামের দৃষ্টিতে ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় মানুষের আচরণে, কথাবার্তায়, লেনদেনে এবং বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ

অর্থ: “একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়েও দেয় না।”

— সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪২

এই হাদিসে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দুটি মৌলিক দায়িত্ব তুলে ধরা হয়েছে—অন্যের প্রতি জুলুম না করা এবং বিপদের সময় তাকে পরিত্যাগ না করা।

কারও সম্পদ আত্মসাৎ করা, প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া, অন্যায়ভাবে অপমান করা, দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্ষতি করা কিংবা তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা—এসবই ভ্রাতৃত্বের চেতনার পরিপন্থী।

একজন প্রকৃত মুসলমানের উপস্থিতিতে অন্য মুসলমান নিজেকে নিরাপদ মনে করবেন। তাঁর কথা, কাজ ও আচরণে অন্যের মনে আস্থা তৈরি হবে। কারণ ভ্রাতৃত্বের দাবি শুধু ভালোবাসা প্রকাশ করা নয়; বরং নিজের দ্বারা যেন অন্য কোনো ভাই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেই দায়িত্বও গ্রহণ করা।

অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়া: মুমিনের হৃদয়ের পরিচয়

একজন মানুষ যখন বিপদে পড়েন, তখন তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় এমন কাউকে, যিনি তাঁর কষ্ট বুঝবেন এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াবেন। আর্থিক সংকট, অসুস্থতা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা জীবনের কঠিন কোনো পরিস্থিতিতে সামান্য সহযোগিতাও অনেক বড় সান্ত্বনা হয়ে উঠতে পারে।

ইসলাম মানুষের এই পারস্পরিক সহমর্মিতাকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে এক অসাধারণ উপমা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন:

“মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ অসুস্থ হলে পুরো দেহ অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৬

একটি দেহের কোনো অংশে ব্যথা হলে যেমন পুরো শরীর অস্বস্তি অনুভব করে, তেমনি একজন মুমিনের কষ্ট অন্য মুমিনের হৃদয়েও সহমর্মিতার অনুভূতি জাগিয়ে তুলবে। এটাই ঈমানি ভ্রাতৃত্বের সৌন্দর্য।

কেউ অভাবের মধ্যে থাকলে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া, বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানো কিংবা হতাশার সময়ে সাহস জোগানো—এসব কাজের মাধ্যমেই এই শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়।

মনে রাখতে হবে, মানুষের কষ্টের কথা শুনে সাময়িক দুঃখ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে তার কষ্ট লাঘবের জন্য এগিয়ে আসাও একজন মুসলমানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

অন্য মুসলমানের সম্মান রক্ষা করা ঈমানি দায়িত্ব

মানুষের কাছে তার সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত মূল্যবান। অর্থ-সম্পদের ক্ষতি যেমন কষ্ট দেয়, তেমনি অপমান, অপবাদ ও অসম্মানও মানুষের হৃদয়ে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে। ইসলাম তাই মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

“হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে। হতে পারে তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না।”

— সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১১

এর পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা কুধারণা, গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান এবং গিবত থেকেও নিষেধ করেছেন।

আজ আমাদের সামাজিক জীবনে প্রায়ই দেখা যায়, সামান্য মতপার্থক্য কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে মানুষ একে অপরকে অপমান করছে। কারও দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা, পেছনে নিন্দা করা কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া অনেকের কাছে যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়।

অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারও সঙ্গে মতের অমিল থাকলেই তার সম্মানহানি করার অধিকার তৈরি হয় না। কারও ভুল থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে অপমান করা কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন মুসলমানের উচিত নিজের জিহ্বা ও আচরণ সংযত রাখা। কারণ কখনো কখনো একটি অসতর্ক কথা, একটি অপমানজনক মন্তব্য কিংবা একটি মিথ্যা অভিযোগ অন্য মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

নিজের জন্য যা ভালোবাসি, অন্যের জন্যও তা ভালোবাসা

মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা হলো নিঃস্বার্থ কল্যাণকামিতা। একজন মুমিন কেবল নিজের সুখ, সফলতা ও উন্নতির কথা ভাববেন না; বরং অন্য মুসলমানের ভালো থাকাও আন্তরিকভাবে কামনা করবেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।”

— সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৫

এই হাদিস আমাদের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার শিক্ষা দেয়। আমরা নিজের জন্য সম্মান, নিরাপত্তা, ভালো ব্যবহার ও সফলতা প্রত্যাশা করি। তাহলে অন্য একজন মুসলমানের জন্যও একই কল্যাণ কামনা করতে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়।

কেউ ভালো চাকরি পেলে তার প্রতি হিংসা নয়, বরং আনন্দিত হওয়া উচিত। কেউ ব্যবসায় সফল হলে তাকে ছোট করার পরিবর্তে তার জন্য দোয়া করা উচিত। কেউ জীবনে এগিয়ে গেলে তার অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি না করে উৎসাহ দেওয়া উচিত।

অন্যের প্রাপ্তিতে ঈর্ষান্বিত না হয়ে তার কল্যাণ কামনা করতে পারাই একজন মুমিনের উদার মানসিকতার পরিচয়। কারণ প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের মধ্যে সংকীর্ণতা, হিংসা কিংবা অন্যের ক্ষতি কামনার কোনো স্থান নেই।

ঐক্য, সম্প্রীতি ও মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা

মুসলিম উম্মাহর শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো পারস্পরিক ঐক্য। তবে ঐক্য মানে এই নয় যে, সবার চিন্তাভাবনা, উপলব্ধি কিংবা মতামত সব সময় এক হবে। মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। বিভিন্ন বিষয়ে আলেমদের মধ্যেও ফিকহি মতভেদ রয়েছে।

কিন্তু মতের এই পার্থক্য যেন পারস্পরিক বিদ্বেষ, ঘৃণা ও শত্রুতার কারণ না হয়। মতভেদ থাকলেও ন্যায়বিচার, শালীনতা ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”

— সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩

এই আয়াত মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দেয়। কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণ করে সত্য, ন্যায় ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের প্রত্যাশা।

কোনো মুসলমানের ভুল দেখলে তাকে অপমান না করে সুন্দরভাবে বোঝানো উচিত। ভুলের প্রতিবাদ করা যেতে পারে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াও জরুরি; তবে তা করতে হবে ন্যায়সংগত পদ্ধতিতে।

কারণ একজন মুসলমানের সঙ্গে মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু সেই অমিল যেন তার প্রতি অন্যায় আচরণের অজুহাত হয়ে না দাঁড়ায়।

মানুষের উপকারে এগিয়ে আসা: দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা নানা সংকটের মধ্য দিয়ে জীবন পার করছেন। কেউ আর্থিক অভাবে প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না, কেউ অসুস্থতার কারণে অসহায় হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত সমস্যায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

সবাই হয়তো প্রকাশ্যে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারেন না। কেউ সংকোচে সাহায্য চান না, আবার কেউ নীরবে নিজের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে যান।

এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলমানের দায়িত্ব শুধু নিজের সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নয়; বরং সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের উপকারে এগিয়ে আসা।

সাহায্য মানেই সব সময় অর্থ দেওয়া নয়। কখনো একটি ভালো পরামর্শ, কিছুটা সময়, প্রয়োজনীয় তথ্য কিংবা বিপদের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোও মানুষের জন্য অনেক বড় সহযোগিতা হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে দেয়, আল্লাহ কিয়ামতের দিনের তার একটি কষ্ট দূর করে দেবেন।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯

এই হাদিস মানুষের উপকার করার গুরুত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরে। একজন অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা আল্লাহর কাছে প্রতিদানের কারণ হতে পারে। তাই মানুষের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানোর সুযোগকে অবহেলা করা উচিত নয়।

আমরা কেউই জানি না, জীবনের কোন মুহূর্তে নিজেরও অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। আজ যাঁর পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছি, আগামীকাল হয়তো তাঁরই মতো কারও সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন হবে।

ভুল ও অন্যায়ের ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্বের ভারসাম্য

মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অর্থ এই নয় যে, একজন মুসলমানের সব কাজকেই সমর্থন করতে হবে। কেউ ভুল করলে তার ভুলকে ভুল বলা প্রয়োজন। কেউ অন্যের অধিকার নষ্ট করলে তার বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

তবে ভুল সংশোধনের পদ্ধতিতেও ইসলামের সৌন্দর্য বজায় রাখতে হবে। কাউকে অপমান করা, তার দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করা কিংবা অযথা শত্রুতা তৈরি করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।

সম্ভব হলে একান্তে, আন্তরিকতা ও সুন্দর ভাষায় ভুলটি বুঝিয়ে বলা উচিত। মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া এবং ভালো পথে ফিরে আসতে উৎসাহিত করাও কল্যাণকামিতার অংশ।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা দেখানো আর তার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া এক বিষয় নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষের কল্যাণ কামনা করতে হবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে এবং সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বজায় রাখতে হবে।

এই ভারসাম্যই মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে একটি বাস্তব ও দায়িত্বশীল সম্পর্কে পরিণত করে।

আজকের সমাজে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব কেন আরও বেশি প্রয়োজন?

বর্তমান সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা অনেক বদলে গেছে। যোগাযোগের সুযোগ বেড়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ঘটেছে, মানুষ একে অপরের সঙ্গে সহজেই যুক্ত হতে পারছে। তবু অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার অভাব দেখা যায়।

ব্যক্তিগত স্বার্থ, অহংকার, হিংসা, ভুল বোঝাবুঝি এবং অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা অনেক সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট করে দিচ্ছে। কখনো সামান্য বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, আবার কখনো অন্যের উন্নতি দেখে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে ঈর্ষা তৈরি হচ্ছে।

এই বাস্তবতায় মুসলিম ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয় তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

এ জন্য প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজের জীবন থেকেই কিছু পরিবর্তনের সূচনা করা—

১. অন্য মুসলমানের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তা রক্ষা করা।

২. গিবত, অপবাদ, মিথ্যা ও পরনিন্দা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

৩. অসহায়, দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

৪. অন্যের সফলতায় হিংসা না করে তার জন্য কল্যাণ কামনা করা।

৫. মতপার্থক্য থাকলেও শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা।

৬. ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজের কল্যাণে কাজ করা।

৭. কারও ভুল দেখলে অপমান না করে সুন্দরভাবে সংশোধনের চেষ্টা করা।

৮. আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং পরিচিত-অপরিচিত মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করা।

এই দায়িত্বগুলো পালনের জন্য বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। নিজের কথা ও আচরণ সংযত রাখা, অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সুযোগ পেলেই মানুষের উপকারে এগিয়ে আসার মাধ্যমেই ভ্রাতৃত্বের চর্চা শুরু করা যায়।

উপসংহার: একজন মুসলমান হোন অন্য মুসলমানের ভরসার আশ্রয়

‘মুসলমান মুসলমানের ভাই’—এটি কেবল একটি সুন্দর বাক্য কিংবা আবেগপূর্ণ স্লোগান নয়; বরং ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও জীবনদর্শন। এই ভ্রাতৃত্বের দাবি হলো, একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের জন্য নিরাপদ, বিশ্বস্ত ও কল্যাণকামী হবেন।

আমরা যদি সত্যিই এই শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তাহলে আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক বেশি সুন্দর হয়ে উঠবে। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অন্যের অধিকার নষ্ট করব না, হিংসা-বিদ্বেষে সম্পর্ক নষ্ট করব না, বরং মানুষের সম্মান রক্ষা করব এবং বিপদের সময় যথাসাধ্য পাশে দাঁড়াব।

মনে রাখতে হবে, মুসলিম পরিচয়ের সৌন্দর্য শুধু কথায় প্রকাশ পায় না; তা প্রকাশ পায় চরিত্রে, আমলে এবং মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণে। আমাদের কারণে অন্য একজন মুসলমান যেন কষ্ট না পান, বরং আমাদের কাছ থেকে যেন নিরাপত্তা, সহযোগিতা ও আন্তরিকতা পান—এই মনোভাবই ভ্রাতৃত্বের বাস্তব প্রতিফলন।

আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যেখানে একজন মুসলমান অন্য মুসলমানের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং কল্যাণকামী সঙ্গী; যেখানে বিপদে কেউ একা থাকবেন না, কারও সম্মান অন্যায়ভাবে ক্ষুণ্ন হবে না এবং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করুন, হিংসা-বিদ্বেষ ও জুলুম থেকে হেফাজত করুন এবং প্রকৃত মুসলিম ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


তথ্যসূত্র ও দলিল

  • পবিত্র আল-কুরআন: সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১০–১২।
  • পবিত্র আল-কুরআন: সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩।
  • সহিহ আল-বুখারি: হাদিস ১৩ ও ২৪৪২।
  • সহিহ মুসলিম: হাদিস ৪৫, ২৫৮৬ ও ২৬৯৯।

আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *