একজন মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির আশপাশে কিছু মানুষ বসবাস করেন, যাঁদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়, কথা হয়। কখনো প্রয়োজনের সময় তাঁদের কাছে যেতে হয়, আবার কখনো তাঁরাই আমাদের প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন। তাঁরাই আমাদের প্রতিবেশী।
প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা একটু আলাদা। আত্মীয় না হয়েও তাঁরা অনেক সময় আত্মীয়ের মতো পাশে থাকেন। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে, বাড়িতে কোনো বিপদ ঘটলে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে সাহায্যের দরকার হলে প্রথমেই যাঁদের কথা মনে আসে, তাঁদের মধ্যে প্রতিবেশীরা অন্যতম।
কিন্তু বাস্তবে আমরা সবাই কি প্রতিবেশীর প্রতি নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করি?
অনেক সময় দেখা যায়, পাশের বাড়ির মানুষটি কেমন আছেন, তাঁর পরিবার কোনো সমস্যায় আছে কি না, সেদিকে আমাদের খেয়ালই থাকে না। আবার সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া, উচ্চ শব্দে অন্যের বিরক্তি সৃষ্টি করা, বাড়ির সামনে ময়লা ফেলা কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা নাক গলানোর মতো ঘটনাও ঘটে।
অথচ ইসলাম প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মুসলমান শুধু নিজের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রতিই দায়িত্বশীল থাকবেন না, তাঁর আশপাশে যাঁরা বসবাস করেন, তাঁদের প্রতিও দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা শুধু ভালো সামাজিক আচরণ নয়, বরং এটি একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের নির্দেশ
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ
অর্থ: “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী ও দূর প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।”
— সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩৬।
এই আয়াতে মহান আল্লাহ আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীর সঙ্গেও ভালো আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে নিকট ও দূর—উভয় ধরনের প্রতিবেশীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, প্রতিবেশী আত্মীয় হোন কিংবা আত্মীয় না হোন, তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করা একজন মুসলমানের দায়িত্ব।

প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা
প্রতিবেশীর অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে সহজেই বোঝা যায়।
তিনি বলেছেন:
“জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমার মনে হলো, তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৪।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলামে প্রতিবেশীর মর্যাদা কত বেশি। প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ করা, তাঁর খোঁজখবর রাখা এবং তাঁর অধিকার রক্ষা করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইসলামে প্রতিবেশীর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার
একজন মুসলমান হিসেবে প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের বেশ কিছু দায়িত্ব রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এসব দায়িত্ব পালন করা কঠিন কিছু নয়। শুধু একটু সচেতনতা ও ভালো মানসিকতা থাকলেই আমরা অনেক কিছু করতে পারি।
১. প্রতিবেশীকে কোনো ধরনের কষ্ট না দেওয়া
প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের প্রথম দায়িত্ব হলো, নিজের কোনো কাজের কারণে যেন তিনি বিরক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
যেমন, গভীর রাতে উচ্চ শব্দে গান বাজানো, অযথা চিৎকার করা, বাড়ির সামনে ময়লা ফেলা, অন্যের চলাচলের রাস্তা আটকে রাখা কিংবা প্রতিবেশীর সম্পদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
আমরা হয়তো নিজের বাড়িতে আনন্দ করছি, কিন্তু আমাদের সেই আনন্দের কারণে পাশের বাড়ির কেউ বিরক্ত হচ্ছেন কি না, সেটিও ভাবা প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়।”
সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কে সেই ব্যক্তি?
তিনি বললেন, “যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৬।
হাদিসটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একজন মুসলমানের কাছ থেকে তাঁর প্রতিবেশী নিরাপদ থাকবেন। তাঁর কথায়, কাজে কিংবা আচরণে যেন অন্য কেউ কষ্ট না পান, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
২. প্রতিবেশীর বিপদে ও অসুস্থতায় পাশে থাকা
পাশের বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে তাঁর খোঁজ নেওয়া, কোনো বিপদে পড়লে সাহায্য করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।
ধরুন, আপনার পাশের বাড়ির একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কাউকে পাচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আপনি যদি একটু সময় দিয়ে সহযোগিতা করেন, সেটি তাঁর পরিবারের জন্য অনেক বড় উপকার হতে পারে।
আবার কারও বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা কিংবা অন্তত সান্ত্বনা দেওয়া উচিত।
সব সময় টাকা দিয়ে সাহায্য করতে হবে এমন নয়। কখনো একটু সময় দেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা কিংবা ভালোভাবে কথা বলাও অনেক বড় সহযোগিতা।
৩. প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা
প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে দেখা হয়। তাই তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় ভালো ব্যবহার করা উচিত।
সামান্য বিষয় নিয়ে রাগারাগি করা, খারাপ কথা বলা, অপমান করা কিংবা অকারণে ঝগড়া করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিন বসবাস করতে হয়। আজকের সামান্য একটি খারাপ আচরণ ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
তাই কোনো বিষয়ে মতের অমিল হলেও শান্তভাবে কথা বলা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন।
৪. প্রতিবেশীর খাবার ও অভাবের খোঁজ রাখা
আমরা যখন ভালো খাবার রান্না করি, তখন প্রতিবেশীর কথাও মনে রাখা উচিত। বিশেষ করে আশপাশে কোনো অসচ্ছল পরিবার থাকলে তাদের খোঁজ নেওয়া আরও বেশি প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আবু যর (রা.)-কে উপদেশ দিয়ে বলেন:
“হে আবু যর! যখন তুমি ঝোল রান্না করবে, তখন তাতে পানি বেশি দেবে এবং তোমার প্রতিবেশীদের খোঁজ নেবে।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৫।
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবেশীর সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার সুন্দর শিক্ষা দিয়েছেন।
আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবেশীকে খাবার দেওয়া উচিত। বিশেষ করে কোনো পরিবার অভাবের মধ্যে থাকলে তাদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।
অনেক সময় সামান্য একটু খাবারও একজন অভাবী মানুষের জন্য অনেক উপকারে আসে। তাই নিজের ভালো থাকার পাশাপাশি প্রতিবেশীর অবস্থার কথাও মনে রাখা উচিত।
৫. প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা
প্রতিবেশীর বাড়ির ভেতরে কী হচ্ছে, তাঁর পরিবারে কী সমস্যা চলছে কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে কী ঘটছে—এসব বিষয়ে অযথা অনুসন্ধান করা ঠিক নয়।
কারও বাড়িতে উঁকি দেওয়া, অনুমতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করা কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত কথা অন্যের কাছে বলে বেড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
ধরুন, কোনো প্রতিবেশীর পরিবারে সমস্যা হয়েছে। বিষয়টি আপনি জানতে পেরেছেন। এখন সেটি অন্যদের কাছে বলে বেড়ানো কিংবা আলোচনার বিষয় বানানো উচিত নয়।
বরং তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা করাই ভালো আচরণ।
৬. প্রতিবেশীর ভালো কিছু হলে খুশি হওয়া
প্রতিবেশীর উন্নতি বা ভালো কোনো খবর শুনলে হিংসা না করে খুশি হওয়া উচিত।
তিনি ভালো চাকরি পেয়েছেন, ব্যবসায় সফল হয়েছেন, নতুন বাড়ি তৈরি করেছেন কিংবা তাঁর পরিবারের কোনো আনন্দের ঘটনা ঘটেছে—এসব বিষয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানানো ভালো।
অন্যের ভালো কিছু হলে মন খারাপ করা কিংবা তাঁর ক্ষতি কামনা করা একজন মুসলমানের জন্য উচিত নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্যের ভালো হওয়া মানে নিজের ক্ষতি হওয়া নয়। প্রত্যেকের রিজিক ও সফলতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত।
তাই প্রতিবেশীর ভালো কিছু হলে তাঁর জন্য দোয়া করা এবং আন্তরিকভাবে আনন্দিত হওয়া উচিত।
৭. প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ না করা
একই এলাকায় বসবাস করলে কখনো কখনো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হতে পারে। জমির সীমানা, রাস্তা ব্যবহার, বাড়ি নির্মাণ কিংবা শব্দের কারণে প্রতিবেশীদের মধ্যে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ঝগড়া-বিবাদ করা ঠিক নয়।
কোনো সমস্যা হলে প্রথমে শান্তভাবে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। রাগের মাথায় খারাপ কথা বলা কিংবা প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকে দূরে থাকতে হবে।
অনেক সময় সামান্য ভুল বোঝাবুঝির কারণে প্রতিবেশীদের মধ্যে বছরের পর বছর কথা বন্ধ থাকে। অথচ একটু ধৈর্য ধরে আলোচনা করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
৮. প্রতিবেশীর বিপদের সময় সাহায্য করা
প্রতিবেশীর বাড়িতে আগুন লাগলে, কেউ দুর্ঘটনায় পড়লে কিংবা কোনো পরিবার হঠাৎ বিপদে পড়লে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা উচিত।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কে কত ধনী, কার সামাজিক অবস্থান কী কিংবা তিনি কোন ধর্মের মানুষ—এসব চিন্তা না করে আগে মানুষের বিপদকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ধরুন, গভীর রাতে পাশের বাড়িতে আগুন লেগেছে। তখন নিজের ঘরে বসে না থেকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাওয়া উচিত।
একইভাবে কোনো প্রতিবেশী আর্থিক সংকটে পড়লে, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার সুযোগ থাকলে তা করা ভালো।
বিপদের সময় একজন প্রতিবেশীর সাহায্য অন্য একটি পরিবারের জন্য অনেক বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে।
৯. প্রতিবেশীর সঙ্গে উপহার ও খাবার বিনিময় করা
প্রতিবেশীদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে ছোটখাটো উপহার ও খাবার বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোনো দিন ভালো কিছু রান্না হলে পাশের বাড়িতে একটু পাঠানো, ঈদ বা অন্য কোনো আনন্দের দিনে খাবার দেওয়া কিংবা সামান্য উপহার দেওয়া যেতে পারে।
এর জন্য অনেক টাকা খরচ করার প্রয়োজন নেই। সামান্য কিছু দিয়েও আন্তরিকতা প্রকাশ করা যায়।
এ ধরনের ছোট ছোট উদ্যোগ প্রতিবেশীদের মধ্যে পরিচিতি ও ভালো সম্পর্ক বাড়ায়।
১০. প্রতিবেশীর সম্মান রক্ষা করা
প্রতিবেশীর সম্মান ও ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি আমাদের যত্নবান হওয়া উচিত।
তাঁর নামে মিথ্যা কথা বলা, গিবত করা, অন্যের কাছে বদনাম করা কিংবা পারিবারিক বিষয় নিয়ে হাসাহাসি করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কোনো প্রতিবেশীর ভুল দেখলে তা নিয়ে সবার সামনে আলোচনা না করে সম্ভব হলে তাঁকে একান্তে সুন্দরভাবে বোঝানো উচিত।
আমরা নিজেরা যেমন চাই না, অন্য কেউ আমাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করুক, তেমনি প্রতিবেশীর ক্ষেত্রেও একই বিষয় বিবেচনা করা উচিত।

অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতিও কি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে?
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার শুধু মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত নয়। একজন অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গেও ভালো আচরণ করতে হবে এবং তাঁর প্রতি কোনো অন্যায় করা যাবে না।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:
“যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে তোমাদের বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে এবং তাদের সঙ্গে ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচারকারীদের ভালোবাসেন।”
— সূরা আল-মুমতাহিনা, আয়াত ৮।
অর্থাৎ, প্রতিবেশী মুসলমান না হলেও তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে।
আমাদের আশপাশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, বিপদের সময় সাহায্য করা, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া এবং তাঁদের সম্পদ ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত।
ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের প্রতি দায়িত্ব থেকেই যায়।
প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করলে কী হতে পারে?
ইসলামে মানুষের অধিকার নষ্ট করাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া এবং তাঁর নিরাপত্তা নষ্ট করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন:
“যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
— সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৬।
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া কত বড় অন্যায়।
আমরা অনেক সময় ইবাদত-বন্দেগি নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু আমাদের আচরণে অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছেন কি না, সেটি খেয়াল করি না। অথচ ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কখনো প্রতিবেশীর সঙ্গে অন্যায় করে থাকি, তাঁর কোনো ক্ষতি করে থাকি কিংবা তাঁকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি তাঁর কাছেও ক্ষমা চাওয়া উচিত। কারও সম্পদের ক্ষতি করে থাকলে যথাসম্ভব সেই ক্ষতিও পূরণ করতে হবে।
একজন ভালো প্রতিবেশী হওয়ার জন্য কী প্রয়োজন?
একজন ভালো প্রতিবেশী হওয়ার জন্য অনেক টাকা-পয়সা কিংবা বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কিছু সাধারণ অভ্যাস গড়ে তুললেই আমরা প্রতিবেশীর প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারি।
যেমন:
- প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হলে হাসিমুখে কথা বলা।
- অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া।
- প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা।
- নিজের কাজের কারণে অন্যের অসুবিধা হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখা।
- প্রতিবেশীর ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখা।
- ঝগড়া-বিবাদ এড়িয়ে চলা।
- সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ও উপহার বিনিময় করা।
- অন্যের সুখে খুশি হওয়া এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো।
এসব কাজ খুব কঠিন নয়। কিন্তু এগুলো মানুষের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে পারে এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
উপসংহার
আমরা প্রত্যেকেই চাই, আমাদের প্রতিবেশীরা ভালো হোক, আমাদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করুক এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়াক। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখি, আমরাও কি তাঁদের সঙ্গে একই আচরণ করি?
আমরা নিজের বাড়িতে শান্তিতে থাকতে চাই, তাই অন্যের বাড়ির শান্তিও নষ্ট করা উচিত নয়। আমরা চাই, কেউ আমাদের বিপদে সাহায্য করুক, তাই প্রতিবেশীর বিপদেও আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। আমরা চাই, অন্যরা আমাদের সম্মান করুক, তাই তাঁদের সম্মানও আমাদের রক্ষা করতে হবে।
ইসলাম আমাদের ঠিক এই শিক্ষাই দেয়। একজন ভালো মুসলমান শুধু নিজের ইবাদত নিয়ে চিন্তা করেন না; তাঁর আচরণে আশপাশের মানুষ কেমন আছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আসুন, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কটা শুধু পাশাপাশি বাড়িতে বসবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্মান ও ভালোবাসার সম্পর্ক হিসেবে গড়ে তুলি। আমাদের কারণে যেন কোনো প্রতিবেশী কষ্ট না পান। বরং প্রয়োজনের সময় যেন তাঁরা আমাদের পাশে পান।
মনে রাখবেন, ভালো প্রতিবেশী হওয়া শুধু অন্যের উপকার করা নয়, এটি নিজের ঈমান ও চরিত্র সুন্দর করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিবেশীর অধিকার সঠিকভাবে আদায় করার, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করার এবং একজন ভালো প্রতিবেশী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
